মাজার বস্তি: মাসে ৩০০ কোটি টাকার মাদক সাম্রাজ্য যেখানে কারোর হাত দেওয়ার সাধ্য নাই

গাজীপুর টংগী তে থাকা সুবাদে, বলতে পারি, কারোর মুরোদ নাই এই জায়গায় হাত দেওয়ার, কারোর নাই!!
কথাটা কেবল রাগের নয়; পরিখা-প্রাচীর, টাকা-পয়সা, ভয়-ভীতি আর রাজনৈতিক আশ্রয় সব মিলিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য।
পুরো দেশে মাদকের আখড়া হচ্ছে ২২ টি বস্তি। এর মধ্যে ১৭ টি বস্তি শুধু গাজীপুর জেলা টংগী থানাধীন।
আমার ছোটবেলা থেকে ফরেসিক ইন্টারেস্ট প্রতি খুবই আগ্রহী।
যার কারণে এসব স্থানে যাওয়া, জানা ও বিশ্লেষণ করা ইত্যাদি আমার প্রবল আগ্রহ জন্ম নিতো। যদি একটি বস্তি দিয়ে উদাহরণ দি, তাহলে কেন হাত দেওয়া কারোর মুরোদ নাই তা বিস্তারিত জানতে পারবেন।
মাজার বস্তি
ঢাকা-গাজীপুর জেলার প্রবেশদ্বার আব্দুল্লাহপুর ও টঙ্গী বাজারে পাশ্ববর্তী ও তুরাগ নদী কুলঘেঁষে অপরাধের অভয়াশ্রম এই বস্তির অবস্থান।
প্রত্যেক টা বস্তির মাদক কেনা ও বেচার ধরণ আলাদা।
যেমন এই বস্তিতে মাদক কেনাবেচার জন্য আছে সেল। প্রত্যেকটি সেলভিত্তিক বিক্রি প্রতিটি সেলের আলাদা নিয়ম-কানুন, আলাদা পাহারা, আলাদা লোকবল।
ঢাকা শহরের নানা প্রান্ত থেকে ক্রেতা আসে; নিরাপদে বসার জায়গা, সেবনের ‘রুম’, মুখে তুলে দেওয়ার সার্ভিস, সবই প্যাকেজের অংশ।
বর্তমানে মোট ৬ সেল আছে। এখানে একেকটি সেলের মালিক বিভিন্ন জন।
যদি আপনি এখানে মাদক ব্যবসা করতে চান; ৫ কোটি টাকা টোল দিয়ে, সেল দেওয়ার লাইসেন্স পাবেন।
সবগুলো সেল থেকে দৈনিক বিক্রি ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার আশপাশ।
সবচেয়ে বেশী মুনাফা আসে হিরোইন মাদকের টাকা টা!!
হিরোইনে টাকাটা অনেক অনেক মানি দ্বিগুণ লাভ!! ওপেন সিক্রেট।
১০০ গ্রাম হিরোইনে দাম হল ৪ লাখ টাকা। তারপর এই ১০০ গ্রাম হিরোইনে ভিতরে 'মেরি' মিলায়, এইটা একটা মেডিসিন।
এইটা মিশ্রন করলে হিরোইন টা হয়ে যায় ২০০ গ্রাম।
এবার এই ২০০ গ্রাম প্যাকেট বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা। ক্রয়মূল্য আর বিক্রয়মূল্যের ফাঁকে যে মার্জিন, সেটাই এই সাম্রাজ্যের প্রান।
তো এবার অংক করি।
ধরলাম,প্রতিদিন ১০ কোটি টাকা সেল হয়। বিক্রি হয় মাসে কত? মাসে ৩০০ কোটি টাকা!!!
কার বাপের সাধ্য আছে শত কোটি টাকা ইকোসিস্টেমে হাত দেওয়ার?
যেখানে পুলিশ খাইতো ১০ লাখ, জুলাই বিপ্লবের পর এখন খায় কুড়ি লাখ।
এছাড়া এই মাদকদ্রব্য আসে পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিনাঞ্চল থেকে, ট্রেন যোগে। টংগী রেল স্টেশনে যাত্রাবিরতী না থাকলেও ট্রেন গুলোর গতি কমানো হয়।
ট্রেনের গতি ধীর হলে, রানিং ট্রেন থেকে বস্তা পালিয়ে দেয়। যা মাদক কারবারিরা সংগ্রহ করে।
আর ট্রেনে ভিতরে থাকা লাইনম্যান পার ফিস ফেনসিডিল ১০০ টাকা করে ভাগ পায়।
আবার, মালিকানাধীন বাসও আছে। মাদক পরিবহনের প্রাইভেট করিডর বলতে পারেন। মাঝেমধ্যে পুলিশ লোকদেখানো অভিযান, ফুটেজ, মাইক, তারপর ম্যানেজ। যে কাহিনিটা আপনি আমিও জানি।
মাসিক চাঁদা এখানে শুরুই হয় কোটি থেকে। সব থানার বিভিন্ন স্তর, এলাকার নেতৃস্থানীয় ১০ জন নেতা, আর তথাকথিত গোয়েন্দা ম্যানেজমেন্ট, সবাইয়ের জন্য আলাদা স্লট।
মাদক কারবারি সবচেয়ে বড় রুট হলো টংগী। এখানে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা অনেক বেশী এবং শিল্প এলাকা হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যাও খুব কম নয়।
দারিদ্র্য এই এলাকার সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যগুলো একটি। সস্তা নেশা ও দ্রুত আয়ের লোভ একসাথে কাজ করে।
এমন সব সুযোগে মাদক এবং বিভিন্ন অপরাধের অভয়াশ্রমে কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, গাজীপুর জেলা।
শর্টকাট লাভ, স্ট্যান্ডার্ডাইজড সেল, কাস্টমার কেয়ার সব মিলিয়ে এটা নিছক অপরাধ নয়, একদম ‘বিজনেস মডেল’। রিস্ক ক্যালকুলেশন, সাপ্লাই-ডাইভারশন, লোকাল প্রোটেকশন ম্যানুয়াল লিখে ফেলা যায়।
আর তাই বলি,কারো বাপের সাধ্য নাই সেটা বন্ধ করে দেওয়ার।

Comments (0)
Log in to leave a comment.
No comments yet
Be the first to share your thoughts