আমরা প্রবেশ করি অনুমতি নিয়ে, আর বিদায় নিই অনুমতি ছাড়া।

মানুষের জীবনের শুরুটা তার নিজের সিদ্ধান্তে হয় না। আমরা কেউ পৃথিবীতে আসার আগে বলিনি, “আমি জন্ম নিতে চাই।” আমাদের আগমন ঘটে অন্য কারও সিদ্ধান্তে, অন্য কারও অপেক্ষায়, অন্য কারও ভালোবাসা আর প্রস্তুতির ভেতর দিয়ে। একটি পরিবার আমাদের জন্য জায়গা তৈরি করে, একটি নাম ঠিক করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। পৃথিবীতে প্রবেশের আগে যেন আমাদের জন্য এক ধরনের অনুমতি তৈরি হয়ে যায়। অথচ বিদায়ের সময় সেই নিয়ম আর থাকে না। মৃত্যু কারও অনুমতি নেয় না, সময় দেখে আসে না, প্রস্তুতির খবরও রাখে না।
জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলোর একটি সম্ভবত এটাই। আমরা জানি একদিন চলে যেতে হবে, কিন্তু কখন যেতে হবে, সেটা জানি না। মৃত্যু এসে জিজ্ঞেস করবে না, আমাদের কাজ শেষ হয়েছে কি না, পরিবারকে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলা হয়েছে কি না, কোনো পুরোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া বাকি আছে কি না, কিংবা বহুদিন ধরে যে স্বপ্নটি “একদিন” পূরণ করার কথা ছিল, সেটার দিকে আদৌ হাঁটা শুরু হয়েছে কি না। আমাদের পরিকল্পনার প্রতি মৃত্যুর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
তারপরও মানুষ অদ্ভুত নিশ্চিন্ততায় ভবিষ্যতের ওপর জীবন জমা রাখতে থাকে। আমরা বলি, একদিন সময় হলে ঘুরতে যাব, পরিস্থিতি ভালো হলে নিজের পছন্দের কাজ শুরু করব, আরেকটু টাকা জমলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাব, ব্যস্ততা কমলে পুরোনো বন্ধুকে ফোন দেব। “পরে করব” কথাটা যেন আমাদের জীবনের সবচেয়ে ব্যবহৃত প্রতিশ্রুতি। অথচ সেই “পরে” যে আমাদের জন্য নিশ্চিতভাবে অপেক্ষা করছে, এমন কোনো নিশ্চয়তা কখনোই দেওয়া হয়নি।
সমস্যা মৃত্যু সম্পর্কে না জানার নয়। আমরা সবাই জানি মৃত্যু আছে। সমস্যাটা হলো, আমরা এমনভাবে বাঁচি যেন সেটা সবসময় অন্য কারও সঙ্গে ঘটে। পরিচিত কারও মৃত্যুর খবর শুনলে কিছুক্ষণের জন্য জীবনকে খুব ছোট মনে হয়। তখন মনে হয়, অহংকারের কী মূল্য, এত রাগ ধরে রাখার কী প্রয়োজন, এত দৌড়ানোরই বা মানে কী? কিন্তু কয়েকদিন পর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। আবার ছোট বিষয় নিয়ে অসন্তুষ্টি, আবার তুলনা, আবার সম্পর্কের দূরত্ব, আবার এমন সব চিন্তা যেগুলো কয়েক মুহূর্তের জন্য জীবন-মৃত্যুর সামনে একেবারেই তুচ্ছ মনে হয়েছিল।
মৃত্যুকে মনে রাখা অবশ্য জীবনকে বিষণ্ণ করে তোলার কথা নয়। বরং মৃত্যুর উপস্থিতি জীবনের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে। যখন আমরা সত্যিই বুঝতে শুরু করি যে সময় সীমিত, তখন অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিজেরাই ছোট হয়ে আসে। কে কী বলল, কে আমাদের পছন্দ করল না, কে আমাদের চেয়ে বেশি সফল, সামাজিক মাধ্যমে কে বেশি প্রশংসা পেল, এসবের গুরুত্ব কমে যায়। কারণ তখন বোঝা যায়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আসলে টাকা নয়, সময়।
টাকা হারিয়ে আবার আয় করা যায়। ব্যর্থতার পর নতুন করে চেষ্টা করা যায়। কোনো জায়গা ছেড়ে গেলে আবার ফিরে যাওয়া যায়। কিন্তু গতকালের একটি ঘণ্টাও আর ফিরে পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতিটি দিন এমন এক সম্পদ, যা প্রতিনিয়ত খরচ হচ্ছে, কিন্তু কখনো পুনরায় অর্জন করা সম্ভব নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে জিনিসটি আমরা আর কোনোদিন ফিরে পাব না, সেটিকেই আমরা সবচেয়ে অবহেলায় খরচ করি।
আমরা প্রায়ই বলি, সময় নেই। বাবা-মায়ের সঙ্গে একটু বসে কথা বলার সময় নেই, পুরোনো বন্ধুর খোঁজ নেওয়ার সময় নেই, নিজের সঙ্গে কয়েক মিনিট চুপ করে থাকার সময় নেই। অথচ অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং, অনর্থক তর্ক, অন্যের জীবন নিয়ে চিন্তা কিংবা এমন সব কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়, যেগুলোর কথা কয়েক বছর পর আমাদের মনেও থাকবে না। সম্ভবত আমাদের সময়ের অভাব নেই; আমরা শুধু সবসময় বুঝতে পারি না কোন সময়টার মূল্য কত।
এই উপলব্ধিটা সাধারণত আসে হারানোর পর। পরিচিত একটি চেয়ার খালি হয়ে গেলে, কোনো পরিচিত নম্বর থেকে আর কখনো ফোন আসবে না বুঝতে পারলে, পুরোনো কোনো ভয়েস রেকর্ডিং শুনলে কিংবা এমন কারও ছবি দেখলে যার সঙ্গে আর একটি কথাও বলা সম্ভব নয়, তখন সাধারণ মুহূর্তগুলোর গুরুত্ব বোঝা যায়। তখন মনে হয়, আরেকটি দিন যদি পাওয়া যেত। আরেকবার পাশাপাশি বসা, আরেক কাপ চা, আরেকটি সাধারণ কথোপকথন। মানুষ শেষ পর্যন্ত বড় আয়োজনের চেয়ে এসব সাধারণ মুহূর্তকেই বেশি মিস করে।
তাই জীবনকে কোনো বিশাল ঘটনার অপেক্ষায় রেখে দেওয়া হয়তো ঠিক নয়। সব স্বপ্ন পূরণ হবে না, সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত থাকবে না, সব প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যাবে না। জীবনের সব কাজ সুন্দরভাবে গুছিয়ে শেষ হওয়ার পরই বিদায়ের সময় আসবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং অসমাপ্ত অবস্থাতেই মানুষকে চলে যেতে হয়। তাই যে কথাটা বলা দরকার, সেটা যতটা সম্ভব আজই বলা ভালো। যাকে ভালোবাসি, তাকে সেটা জানানো ভালো। ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া ভালো। বহুদিনের কোনো স্বপ্ন থাকলে অন্তত তার দিকে প্রথম পদক্ষেপটা নেওয়া ভালো।
একদিন আমাদের প্রত্যেকের অনুপস্থিতিতেও পৃথিবী স্বাভাবিকভাবে চলবে। সকাল হবে, মানুষ কাজে যাবে, দোকান খুলবে, রাস্তায় যানজট হবে, কেউ প্রেমে পড়বে, কেউ ঝগড়া করবে, কেউ নতুন জীবন শুরু করবে। পৃথিবী থেমে থাকবে না। শুনতে কঠিন হলেও এই সত্যের মধ্যে একধরনের মুক্তি আছে। যদি পৃথিবী আমাদের ছাড়া চলতেই পারে, তাহলে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে নিজের জীবন নষ্ট করারও বিশেষ অর্থ নেই।
আমাদের হাতে মূলত মাঝখানের এই সময়টুকুই আছে। জন্মের সিদ্ধান্ত আমাদের ছিল না, মৃত্যুর সময়ও আমাদের হাতে নেই। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝখানে আমরা কীভাবে বাঁচব, কাদের ভালোবাসব, কী তৈরি করব, কোন ভুল থেকে শিখব, কোন সম্পর্ককে গুরুত্ব দেব, তার কিছুটা অন্তত আমাদের হাতে আছে।
আমরা প্রবেশ করি অনুমতি নিয়ে, আর বিদায় নেই অনুমতি ছাড়া। তাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কত বছর বেঁচে ছিলাম, সেটা নয়। প্রশ্নটা হলো, যতদিন ছিলাম, ততদিন সত্যিই বেঁচেছিলাম কি না।
Comments (1)
Log in to leave a comment.
নির্মম সত্য